চরাঞ্চলের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১২, ২০২৩, ৪:৪৩ অপরাহ্ণ / ১১৬
চরাঞ্চলের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি

হাবিবুর রহমান হবি  বিশেষ প্রতিনিধিঃ 

শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলের মানুষ ও প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের একমাত্র ভরসা এখন ঘোড়ার গাড়ি। চরের উৎপাদিত বাদাম, ভুট্টা, মসুর ডাল, বোরো ধান, মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন পণ্য ঘোড়ার গাড়িতে বহন করে বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে যাচ্ছে চরের কৃষকরা। ছাড়াও মানুষের চলাচলে বাহন হিসাবে ব্যবহারিত হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি। গাইবান্ধার সুুন্দরগঞ্জ উপজেলা তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের চিত্র এটি। 

উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর,কঞ্চিবাড়ী, কাপাশিয়া ইউনিয়নের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদী ভাঙনের কারনে একবারে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে নেই তেমন কেনো নির্দিষ্ট রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে। চরাঞ্চলের পরিতিত্যক্ত জমির ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য অস্থায়ী রাস্তাদিয়ে ছুটে চলছে ঘোড়ার গাড়ি। দুর্গম এ চরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা আর শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলের মালামাল বহনের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। আর এ গাড়ি চালিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে প্রায় দুই-তিন শতাধিক পরিবার। উল্লেখিত এই ইউনিয়ন গুলোর  খোদ্দা, জিগাবাড়ি, বিরহিম,কিশামত সদর, লালচামার, কাজিয়াচর, বাদামের চর,কারেন্ট বাজার, ভাটি কাপাশিয়াসহ প্রায় ২৫-৩০টি এলাকায় কোনো যানবাহন চলাচলের উপায় না থাকায় চরের মানুষজন বালুময় পথে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন।

এমনকি তাদের উৎপাদিত পণ্য মাথায় ও ভারে করে করে আনা-নেওয়া করতে হত। এখন চরাঞ্চলের মানুষের মালামালের বাহন হিসেবে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরাঞ্চলের চাষীদের উৎপাদিত ফসলও জমি থেকে তুলে বাড়ি নেওয়া ও উপজেলা সদরে বিক্রির জন্য নদীর ঘাটে নিয়ে যাওয়ার ভরসা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি।

পানি কমে যাওয়ায় বর্তমানে তিস্তানদীর চরাঞ্চল এখন মরুভূমিসম। এতে উপজেলার চরের প্রায় ৩০টি গ্রাম বাসীর লোকজন যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ঘোড়ার গাড়িযোগে বহন করছেন। এতে একদিকে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হয়েছে, অন্যদিকে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা এসেছে পরিবারগুলো।

উপজেলার কাপাশিয়া ইউনিয়নের ভাটি কাপাশিয়ার চরের এক ঘোড়ার গাড়ির চালক সুরুজ্জামান মিয়া বলেন, আমরা গরিব মানুষ, কাম না করলে খাবো কী? একবেলা কাম করলে আরেকবেলা কাম করতে পারি না। বাজারে জিনিশ পাতির দাম বাড়ছে সংসার চালানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়াই ঘোড়ার গাড়ি চালাই। দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা উপার্জন করি। আবার ঘোড়ার খাবারের জন্য প্রতিদিন ব্যয় করতে হয় ২০০-২৫০ টাকা। বাকি টাকায় চলে সংসার। তিনি আরও বলেন, দুই বছর আগেও এই চরাঞ্চলে ২০-২৫ টা ঘোড়ার গাড়ি ছিল। আর এখন এই ইউনিয়নে ৫০-৭০টা ঘোড়ার গাড়ি হয়েছে। দিন দিন ঘোড়াগাড়ির চাহিদা বাড়ছে।

উপজেলার কারেন্ট বাজার এলাকার ঘোড়ার গাড়ির চালক নুরজামান বলেন, দুই বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছি। দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ শ টাকা কামাই হয়। তা দিয়ে সংসার ভালোই চলছে। শুকনো মৌসুমে আয়ের পরিমান আরও বাড়ে। তারাপুর ইউনিয়নের ঘোড়ার গাড়ি চালক মোকলেছুর রহমান বলেন, আগে মাথায় করে কৃষিপণ্য হাট-বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতাম। কিন্ত এখন ঘোড়ার গাড়ি হওয়ায় খুব সহজে মালামাল পরিবহন করা যায়। এক মণ ভুট্টা বা ধান বহন করতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ভাড়া দিয়ে মালামাল গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া যায়।তিনি আরও বলেন, তারা পারিবারিক সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। শুধু নিজেরা সচ্ছল হননি। তাদের দেখাদেখি আরো বহু লোক ঘোড়া পালন করে সচ্ছল হয়েছেন। তিনি আরো জানান, ঘোড়া লালন-পালন করা কঠিন কিছু নয়। গরু যা খায় না, ঘোড়া তাও খেয়ে থাকে। এছাড়া এখানে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে লালন-পালনের একটা বাড়তি সুবিধা রয়েছে। বর্ষাকালে ঘোড়াওয়ালারা পানি পাড়ি দিয়ে জেগে থাকা চরে অনেক ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে আসেন। ঘোড়া জলমগ্ন ঘাসও খায়। 

কাপাশিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মন্জু মিয়া বলেন, তিস্তা নদী ভাঙনের এলাকার যতো মালামাল সব পরিবহন করা হয় ঘোড়ার গাড়িতে।

বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪ শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করছে। আমার ইউনিয়নে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি গাড়ি রয়েছে। এদের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দরকার।

 উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোছাঃ সুমনা আক্তার জানান, ঘোড়া একটি নিরীহ প্রাণী। এর তেমন রোগবালাই নেই। খাবারেও খুব একটা বাছ-বিচার নেই। ঘোড়ার গাড়ি করা যেমন লাভজনক তেমিন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঘোড়ার খামার করাও লাভজনক। এসব চরের অবারিত মাঠ ঘোড়ার উপযুক্ত চারণভূমি। সেখানে ঘোড়া পালন করে অনেকেই লাভবান হচ্ছেন। বহু মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।