অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন সাত শতাধিক যুব নারী-পুরুষ


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৩, ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ / ১১০৬
অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন সাত শতাধিক যুব নারী-পুরুষ


প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
ইউসুফ আলী (২১) বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার উপজেলার গিদারী গ্রামে। এসএসসি পাশ করার পর এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের আর্থিক দৈন্যতায় এইএসসি পরীক্ষা দেয়া তার হয়নি। একারনে সংসারের অভাব অনটন দূর করতে মাঝে-মধ্যে পিতার সাথে দিনমজুরের কাজ করলেও তাতে সারা মাসজুড়ে না থাকায় বেশিরভাগ সময় বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাকে। তবে তার পরিকল্পনা ছিল কারিগরি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে সম্মানজনক কাজের সাথে যুক্ত করা। কিন্তু এই সুযোগ গয়ে ওঠে গ্রামেই মায়ের একটি ক্ষুদ্র সংগঠন ওয়ার্ড কমিটির এর মাধ্যমে সম্পৃক্ততা হয় বেসরকারি সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে স্ট্রমী ফাউন্ডেশন এর সিডস প্রকল্পের সাথে। তার স্বপ্ন অনুযায়ী পাশেই গিদারী বাজারের একটি মোবাইলের দোকানে এক ওস্তাদের কাছে লিংকেজ করে দেয় ওই সংস্থাটির মাঠ কর্মীরা। এখানে সে ২০২২ সালে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দোকানটিতে এসে হাতে-কলমে মোবাইল সার্ভিসিং শেখেন। ছয় মাস পর ওস্তাদের দোকানেই সে কাজের সুযোগ পায়। প্রতিদিন সে ৩শ টাকা করে ওস্তাদের নিকট থেকে পারিশ্রমিক পায়। এইসময়ের মধ্যে সংস্থাটির সিডস্্ প্রকল্প থেকে ব্যবসার জন্য ৪হাজার ৫শ টাকা সহায়তা গ্রহণ করে এবং নিজের জমানো আরো কিছু অর্থ দিয়ে যন্ত্রপাতি ক্রয় করে কঞ্চিপাড়া বাজারে ভাড়া একটি দোকানে এককভাবে মোবাইল সার্ভিসিং এর দোকান চালু করে। প্রায় একবছরের মধ্যে ইউসুফ এর দোকানটি ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছে এবং প্রতিদিন এই দোকান থেকে প্রায় গড়ে ৪ থেকে ৫শ টাকা উপার্জন করছেন।
সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নের লিখন মিয়া (১৯) দারিয়াপুর বাজারে এক ওস্তাদের কাছে টিভি মেরামত বিষয়ে হাতে কলমে ৬মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ২০২২সালে। ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে সে আলাদা করে একটি দোকান খুলে বসেন। সেও সংস্থাটির মাধ্যমে ৪হাজার ৫শ টাকা ব্যবসার জন্য সহায়তা গ্রহণ করে। লিখন মিয়াও এলাকাতে থেকে দিনে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬শ টাকা আয় করছেন। আরেকজন প্রশিক্ষণগ্রহণকারী সাইফুল ইসলাম এর বাড়ি সদর উপজেলার ঘাগোয়া গ্রামে। সে দাড়িয়াপুর বাজারে ওস্তাদ খুশি মিয়ার কাছে ৬মাস প্রশিক্ষণগ্রহণ করেন। এখন সে ওস্তাদের কাছে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন।
ওস্তাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই একটি কম্পিউটার ক্রয় করে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি বাজারে ব্যবসা শুরু করেছেন আনিছুর রহমান। তিনি জানান, অভাবের কারনে বিএ ভর্তি হয়েও পড়ালেখা শেষ করতে পারিনি। একারনে তিনি সিডস প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছেন। কম্পিউটার ব্যবসা করে ভালই চলছে তার আয়-উপার্জন। প্রতিমাসে তার গড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার পর্যন্ত আয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়রে মীরের বাগান গ্রামের রবিন্দ্র নাথ ওস্তাদ মালেকের কাছে হেয়ার কার্টিং এর উপর প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি কিছুদিন ওস্তাদের সাথে থেকে আরো বেশি দক্ষতা অর্জন করে সে নিজেই এখন পৃথক একটি সেলুন দিয়েছেন।
সদর উপজেলার আরেক যুবক শয়ন চন্দ্র ওস্তাদ দিলীপ চন্দ্রের কাছে ছয়মাস প্রশিক্ষণ ও একটি সনদ নিয়ে এখন সে সেনাবাহিনীতে হেয়ার কাটিং হিসেবে অস্থায়ীভিত্তিতে চাকুরী পেয়েছেন।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ি গ্রামের রিদয় ইসলাম জানান, ছয় মাসের প্রশিক্ষণ আমার জীবনের মোড় পাল্টে দিয়েছে। আমি এখন প্রতিদিন ৫শ টাকা করে রোজগার করছি। এই প্রশিক্ষণ না পেলে কম মূল্যে কাজ করতে হতো এবং হয়তো তিনশ টাকার বেশি পেত না বলে জানান তিনি।
সদর উপজেলার ঘাগোয়া গ্রামের বিউটিশিয়ান মৌসুমি (ওস্তাদ) বলেন, নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে গ্রামের বেকার যুব নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করি। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সংস্থা থেকে সামান্য সম্মানী প্রদান করলেও একজন বেকার নারী যখন প্রশিক্ষণ নিয়ে জীবনগড়ে তখন ভাল লাগে।
এই প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ৬৯৩ জন যুব নারী-পুরুষ ওস্তাদ-গুরুর কাছে এ্যাম্বেডারি, হেয়ার কার্টিং, মটরসাইকেল মেকানিক, ফার্মাসি, বিউটি পার্লার, ইলেকট্রনিক এন্ড হাউজ ওয়ারিং, কম্পিউটার অপারেটিং, রং মিস্ত্রি, পাপোষ ও মাদুর তৈরি, ওয়েলডিং, কাঠমিস্ত্রি. ট্রেইলরিং এসব বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণগ্রহণ করে জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের সিডস প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আফতাব হোসেন জানান, দাতা সংস্থা স্ট্রমী ফাউন্ডেশন এর সহায়তা সিডস প্রকল্পটি গাইবান্ধা জেলা সদর, ফুলছড়ি ও গোবিন্ধগঞ্জ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে অতিদরিদ্র নারীদের জীবনমানের উন্নয়নে নানামূখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে একটি কর্মসূচি হলো বেকার যুব নারী পুরুষদের স্থানীয়ভাবে ওস্তাদ-গুরুর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক ৬মাসব্যাপি প্রশিক্ষণ প্রদান করে কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করা। এই কনসেপ্টটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কার্যকরী এবং প্রশিক্ষণে খরচও কম। মাত্র ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় ৬মাসের কোর্স সম্পন্ন করা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, প্রশিক্ষণগ্রহণকারী এখন প্রায় সকলেই আয়-উপার্জনমূলক কাজের সাথে যুক্ত রয়েছে এবং পরিবারে অর্থনৈতিকভাবে ভূমিকা দারিদ্রবিমোচনে সহায়তা করে যাচ্ছে।
এবিষয়ে বিসিক এর উপ-সহকারি পরিচালক রবিন চন্দ্র জানান, ওস্তাদ-গুরু প্রশিক্ষণ বেকার যুব নারী পুরুষের কর্মসংস্থা ও আয় উপার্জনে বেশ ভূমিকা রাখছে। এদের অর্থনৈতিক সুবিধা বা ঋণ দেয়া হলে ব্যবসায় বেশ উন্নতি করবে।